ম্যাপলের দেশ কানাডায় উচ্চশিক্ষা : সম্পূর্ণ গাইডলাইন

উত্তর আমেরিকায় প্রশান্ত, আর্কটিক আর অ্যাটলান্টিক মহাসাগরের কোল জুড়ে অবস্থিত পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ, কানাডা। ধারণা করা হয়ে থাকে, প্রাচীনকাল থেকেই ইন্দো-আমেরিকান জাতিগোষ্ঠী এখানে বসতি গড়ার চেষ্টা চালায়। তবে, পনেরশো শতাব্দী থেকে ইংরেজ ও ফরাসী অভিযাত্রীরা এখানে স্থায়ী বসতি গড়তে শুরু করে।

১৭৬৩ সালে ইংরেজরা, ফ্রেঞ্চ উপনিবেশ থেকে কানাডা দখল করে নেয়। অবশ্য ১৮৬৭ সালে দেশটি ত্বরান্বিত রাজনৈতিক অবস্থার জন্য গ্রেট ব্রিটেইনের কাছ থেকে স্বায়ত্ব শাসন অর্জন করে। কিন্তু কমনওয়েলথভুক্ত হওয়ায়, এখনও ম্যাপল লিফের এই দেশটির প্রধান; রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ। চলুন আজ জেনে আসা যাক নায়াগ্রা জলপ্রপাতের দেশ, কানাডায় উচ্চশিক্ষা সম্পর্কে খুঁটিনাটি।

কেন পড়বেন কানাডায়?

যদি প্রথমেই শান্তির দিক বিবেচনায় বলি, কানাডা হলো বিশ্বের সপ্তম শান্তিপূর্ন দেশ। এখানের নাগরিক সুযোগ-সুবিধার অন্ত নেই বললেই চলে। মারাত্মক রকমের কর খেকো শাসন ব্যবস্থা হলেও এখানের বিলাসী জীবন, অনেক দেশের কাছেই ঈর্ষনীয়। এরপরে যদি শিক্ষার মানের কথাতে আসি, QS Ranking বলুন বা The Times Higher Ranking ই বলুন, সব জায়গাতেই রয়েছে কানাডিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়গুলির শ্রেষ্ঠত্বের ছড়াছড়ি। নিঃসংকোচে বলা যায়, কানাডিয়ান গবেষণা ভিত্তিক পড়াশোনার মান অত্যন্ত উঁচু মানের। কানাডিয়ান শিক্ষাগত যোগ্যতা যেকোনো দেশেই অনেক বেশি চাহিদা সম্পন্ন।

তাছাড়া, এখানে পড়াশোনা চলাকালীন সময়ে Part-Time জব না করেও, Co-Op পদ্ধতির মাধ্যমে সরাসরি যেকোনো কানাডিয়ান কোম্পানিতে ইন্টার্নশিপ, এমনকি চাকুরীও করা যায়। সেখানের আয় করা টাকা দিয়ে সহজেই পরিশোধ করা যায় সেমিস্টার ফি গুলি।

তাছাড়া, মাল্টি কালচার এবং সহজ ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা থাকায় পড়াশোনা শেষ করে চাকুরীতে ঢোকার ৫ বছরের মধ্যেই রয়েছে স্থায়ী নাগরিক হওয়ার সুবিধা। তাহলে কেনো আমরা উচ্চশিক্ষার গন্তব্য হিসেবে কানাডাকে পছন্দের তালিকাতে রাখবো না? কমেন্ট করে জানাতে পারেন কিন্তু…

কোন ডিগ্রি নিয়ে পড়া যায় কানাডায়?

বাংলাদেশ বা ভারতীয় অঞ্চলের আগ্রহী ছাত্র-ছাত্রীরা সাধারণত উচ্চশিক্ষার জন্য কানাডাকে বেছে নিয়ে থাকে। তবে সুবিধা হলো, কানাডাতে হাই স্কুল লেভেলেও পড়া যায়! আর উচ্চ শিক্ষার জন্য পড়া যায় –

  • ফাউন্ডেশন বা কালচারাল কোর্স
  • আন্ডার-গ্র্যাড বা ব্যাচেলর্স ডিগ্রি
  • পোস্ট-গ্র্যাড বা মাস্টার্স-পিএইচডি ডিগ্রি

 

কি ধরণের প্রোফাইল লাগে?

কানাডাতে পড়তে সাধারণত ততটা ধরাবাঁধা কোনো নিয়ম মানা লাগে না। একদমই সাধারণ কিছু যোগ্যতা থাকলেই সেখানে পড়াশোনার সুযোগ লাভ করা যায়। তারপরেও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে;

 

PhD/Doctoral ডিগ্রির জন্য –

  • ২ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা
  • মাস্টার্স ডিগ্রি সনদ (থিসিস সহ)
  • ব্যাচেলর্স ডিগ্রি সনদ (থিসিস সহ)
  • গবেষণা পত্র (যদি থাকে)
  • উচ্চ মাধ্যমিক সনদ
  • মাধ্যমিক সনদ
  • IELTS Band Score কমপক্ষে 6.5 (প্রথম সারির কিছু বিশ্ববিদ্যালয় বাদে)
  • GRE Score (সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রযোজ্য নয়)
  • প্রাক্তন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি এবং কর্মস্থল থেকে একটি Recommendation Letter
  • SOP বা Statement of Purpose (যেখানে অবশ্যই Extra-Curricular কাজগুলির উল্লেখ থাকতে হবে)
  • CV বা Resume (কোনো নির্দিষ্ট ফর্মেটের প্রয়োজন নেই)

মাস্টার্স ডিগ্রির জন্য –

  • ১ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা
  • ব্যাচেলর্স ডিগ্রি সনদ (থিসিস সহ)
  • গবেষণা পত্র (যদি থাকে)
  • উচ্চ মাধ্যমিক সনদ
  • মাধ্যমিক সনদ
  • IELTS Band Score কমপক্ষে 6.0 (প্রথম সারির কিছু বিশ্ববিদ্যালয় বাদে)
  • GRE Score (সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রযোজ্য নয়)
  • প্রাক্তন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইজন প্রফেসরের কাছ থেকে দুইটি Recommendation Letter
  • SOP বা Statement of Purpose (যেখানে অবশ্যই Extra-Curricular কাজগুলির উল্লেখ থাকতে হবে)
  • CV বা Resume (কোনো নির্দিষ্ট ফর্মেটের প্রয়োজন নেই)

ব্যাচেলর্স ডিগ্রির জন্য –

  • উচ্চ মাধ্যমিক সনদ
  • মাধ্যমিক সনদ
  • IELTS Band Score কমপক্ষে 5.5 (প্রথম সারির কিছু বিশ্ববিদ্যালয় বাদে)
  • GRE Score 280 (প্রথম সারির কিছু বিশ্ববিদ্যালয় বাদে)
  • কলেজের দুই শিক্ষকের কাছ থেকে দুইটি Recommendation Letter
  • SOP বা Statement of Purpose (কেনো পড়তে যাচ্ছি এবং কেনো ঐ বিশ্ববিদ্যালয় পছন্দ করেছি, সেটা অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে)
  • CV বা Resume (কোনো নির্দিষ্ট ফর্মেটের প্রয়োজন নেই)

ফাউন্ডেশন কোর্সের জন্য –

  • উচ্চ মাধ্যমিক সনদ
  • মাধ্যমিক সনদ
  • IELTS Band Score কমপক্ষে 5.0
  • কলেজের দুই শিক্ষকের কাছ থেকে দুইটি Recommendation Letter
  • SOP বা Statement of Purpose (কেনো পড়তে যাচ্ছি এবং কেনো ঐ কোর্স পছন্দ করেছি, সেটা অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে)
  • CV বা Resume (কোনো নির্দিষ্ট ফর্মেটের প্রয়োজন নেই)

 

বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে বছরের কোন সময়ে আবেদন করতে হয়?

অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ই সাধারণত বছরের Fall Semester এ সকল ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তি করিয়ে থাকে। তবে আন্ডার-গ্র্যাড কোর্সে আবেদনের সময়সীমা ফেব্রুয়ারি/মার্চ থেকে জুনের মধ্যভাগ পর্যন্ত হয়ে থাকে। আর পোস্ট গ্র্যাড কোর্সগুলিতে আবেদনের সময়সীমা ডিসেম্বর/জানুয়ারি থেকে মার্চ অবধি হয়ে থাকে।

 

কানাডিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে খরচ কেমন?

কানাডিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়গুলির প্রতিটিই আলাদা আলাদা নিয়মে টিউশন ফি ধার্য করে থাকে। তাছাড়া উত্তরের বিশওবিইদ্যালয়গুলিতে টিউশন ফি কিছুটা কম। এরপরেও একদম সাধারণ হিসেব কষতে গেলে, কানাডায় ব্যাচেলর্স কোর্সে পড়তে প্রায় ১৪-১৬ হাজার ডলার, মাস্টার্স এবং পিএইচডি কোর্সের জন্য প্রায় ১০-১২ হাজার কানাডিয়ান ডলার খরচ হয়।

 

টিউশন ফি বেশি হলেও, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সব থেকে বড় সুবিধা হলো এখানের Co-Op Program গুলি। এসব প্রোগ্রামে পড়ে, আপনি সহজেই চাকুরি করে নিজ আয় থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিস্টার ফি দিতে পারবেন। বর্তমানে কানাডার অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়েই চালু রয়েছে এই Co-Op কোর্সগুলি। সাধারণত Co-Op Program গুলিতে Engineering, BBA, Applied Science, Health, Medicine, Nursing, Social Science, Environmental Science এবং Arts সহ আরও বিভিন্ন কোর্স করা যায়।

 

কানাডাতে কি কি স্কলারশিপ নিয়ে পড়া যায়?

কানাডা প্রতি বছর প্রতিটা ছাত্র-ছাত্রীর পেছনে বেশ মোটা অংকের ডলার খরচ করে থাকে। এখানে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে স্কলারশিপ। ছাত্র-ছাত্রীরা খুব সহজেই এসব স্কলারশিপের মাধ্যমে টিউশন ফি ছাড়াই নিজের পড়াশোনা শেষ করতে পারে। তবে এজন্য পড়াশোনাতে সামান্য মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। এতো এতো স্কলারশিপের ভিড়ে চলুন জেনে নেই সব থেকে জনপ্রিয় কিছু স্কলার্শিপ –

  • ভেনিয়ার কানাডা গ্র্যাজুয়েট স্কলারশিপ
  • আইডিআরসি ডক্টরাল রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড
  • ইন্ডাস্ট্রিয়াল পোস্ট গ্র্যাজুয়েট স্কলারশিপ
  • রিসার্চ এসোসিয়েট স্কলারশিপ
  • স্টেট স্কলারশিপ
  • প্রেসিডেন্সিয়াল স্কলারশিপ
  • ইউনিভার্সিটি স্কলার্শিপ সহ ইত্যাদি

 

কানাডাতে একজন স্টুডেন্টের মাসিক খরচ কত?

কানাডাতে ১০ টি প্রদেশ বা Province রয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশগুলিতে সাধারণত উত্তরের প্রদেশগুলির তুলনায় মাসিক খরচ কিছুটা বেশি। অতিরিক্ত ঠাণ্ডার জন্য কানাডার দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশগুলিতে লোক সমাগমও উত্তরের থেকে কিছুটা বেশি। আর এজন্য সেসব প্রদেশের প্রাদেশিক রাজধানীসহ অন্যান্য দক্ষিণ তীরবর্তি শহরগুলিও বেশ বড় এবং ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র। আর জীবনযাপনের মান যেখানে বেশি ভাল, সেখানে খরচ টাও একটু বেশিই দেখা যায়। তবে গড় হিসাব করলে একজনের মাসিক খরচ মোটামুটি ১০০০-১২০০ ডলারের কাছাকাছি। যা ছাত্র-ছাত্রীরা পার্ট-টাইম কাজের মাধ্যমে সহজেই উপার্জন করতে পারে।

 

কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়গুলি কিভাবে খুঁজে পাবো?

কানাডায় ১০টি প্রদেশের ৯৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন কোর্সে প্রতি বছর প্রায় কয়েক হাজার ছাত্র-ছাত্রী অধ্যয়ন করে থাকে। আসুন প্রদেশভেদে চিনে নেই কানাডার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে –

 

Alberta
British Columbia
Manitoba
New Brunswick
Newfoundland and Labrador
Nova Scotia
Ontario
Prince Edward Island
Quebec
Saskatchewan
Yukon

 

কানাডায় উচ্চশিক্ষা সম্পর্কিত আরও কোনো তথ্য জানার থাকলে, নিচের কমেন্ট বক্সে জানাতে পারেন। আমরা দ্রুত সময়ে আপনার উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব।

 

তারপর? কানাডা যাওয়ার পর কি করবেন? eGal Team কে মিষ্টি খাওয়াতে ভুলবেন নাতো? 😁

 

উচ্চশিক্ষা সম্পর্কিত আমার আরও লেখা

ভ্রমণ সম্পর্কিত লেখা

বিজ্ঞান ভিত্তিক লেখা

Jowad

2 thoughts on “ম্যাপলের দেশ কানাডায় উচ্চশিক্ষা : সম্পূর্ণ গাইডলাইন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *