জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার সুবিধা ও অসুবিধা

কোন একটি দেশে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার আগে অনেকগুলো বিষয় বিবেচনায় রাখতে হয়। শুধুমাত্র উচ্চশিক্ষার জন্য দেশটি ভালো হলেই দেশটিতে যাওয়া উচিত হয়। সার্বিক দিক বিবেচনা করেই মূলত একটি দেশকে উচ্চশিক্ষার গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা কেমন, দেশটিতে পড়াশোনার খরচ কত, পার্ট টাইম জবের সুযোগ রয়েছে কিনা, থাকা খাওয়ার খরচ কত, জীবনমান কেমন, শিক্ষা জীবন শেষ করে স্থায়ীভাবে বসবাস করা যায় কীনা, নাগরিকত্ব লাভের সুযোগ রয়েছে কীনা এইরকম বিষয়গুলি বিবেচনা করেই একটি দেশকে বেছে নেওয়া হয় উচ্চশিক্ষার গন্তব্য হিসেবে। উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য আজকের এই আর্টিকেলে জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার সুবিধা অসুবিধা নিয়ে আলোচনা করব।

প্রতিটি দেশের নিজস্ব কিছু নিয়ম কানুন রয়েছে। রয়েছে কিছু সুযোগ সুবিধা। সেই সাথে অসুবিধা থাকাটাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। যেহেতু আপনি একজন ইন্টারন্যাশনাল ছাত্র হিসেবে এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাবেন, সেহেতু আপনার সুবিধার পাশাপাশি অনেকগুলো অসুবিধাও থাকতে পারে। সেইগুলো নিয়েই মূলত কথা বলার চেষ্টা করব।

জার্মানিতে উচ্চশিক্ষা

ইউরোপের অন্যতম অর্থনৈতিক সমৃদ্ধশালী দেশ জার্মানি। দেশটির শিক্ষাব্যবস্থায় টিউশন ফি ছাড়াই উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করার সুযোগ রয়েছে। রয়েছে কয়েক হাজার কোর্স থেকে আপনার পছন্দের কোর্সে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ। এসবকিছু মিলিয়ে সাম্প্রতিককালে শিক্ষার্থীদের পছন্দের কেন্দবিন্দুতে রয়েছে দেশটি।

আরোও পড়ুনঃ জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার খুটিনাটি

জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার সুবিধা

  • বিনামূল্যে পড়াশোনার সুযোগ
  • উচ্চমানের শিক্ষা
  • সহজ আবেদন প্রক্রিয়া
  • পার্ট টাইম জবের সুবিধা
  • চাকরি খোঁজার ভিসা (Job Seeking Visa)
  • উচ্চ বেতনের চাকরি
  • স্পাউস নেওয়ার সুযোগ
  • ফ্রি ভ্রমণ সুবিধা
  • স্থায়ী হবার সুযোগ

বিনামূল্যে পড়াশোনার সুযোগ

জার্মানি এমন একটি দেশ যেখানে পড়তে কোন প্রকার টিউশন ফি লাগেনা। দেশটির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোন প্রকার টিউশন ফি দিতে হয়না। আপনি যদি টিউশন ফি ছাড়া বিশ্বমানের ডিগ্রী অর্জন করতে চান তবে জার্মানি আপনার জন্য ভালো সুযোগ হতে পারে। দেশটিতে পড়তে যাওয়া বেশিরভাগ শিক্ষার্থী বিনামূল্যে পড়াশোনা করতে পারার কারনে দেশটিকে বেছে নেন। বিনামূল্যে উচ্চশিক্ষার সুযোগটি আপনিও গ্রহন করতে পারেন।

উচ্চমানের শিক্ষা

জার্মান ডিগ্রীর কদর বিশ্বজুড়ে। উচ্চশিক্ষায় বেশ এগিয়ে এই দেশটি। বিশ্বের সেরা ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কানাডার ৩টি সেই সাথে জার্মানদের দখলেও ৩টি। যেখানে কানাডায় ব্যাচেলর কিংবা মাস্টার্স করতে লাখ লাখ টালা লেগে যায়, সেখানে জার্মানিতে পড়াশোনা প্রায় ফ্রি। আমি যদি সার্বিক তুলনা করি জার্মানি কোন অংশে কম নয়, বরং এদিক থেকে এগিয়ে থাকবে। সুতরাং লাখ লাখ টাকা খরচ করে যুক্ত্রাষ্ট, কানাডা কিংবা যুক্তরাজ্যে পড়ার চেয়ে জার্মানিতে পড়া বুদ্ধিমানের কাজ নয় কি? তবে স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে চাইলে যুক্তরাষ্ট কিংবা কানাডা আপনার জন উত্তম জায়গা হতে পারে।

সহজ আবেদন প্রক্রিয়া

জার্মানিতে কোর্স খোঁজা ও অবেদন করা খুবই সহজ। আপনাকে কোন প্রকার এজেন্সি বা দালালের কাছে যেতে হবে না। আপনি ঘরে বসেই আপনার এপ্লিকেশন প্রসেসটি সম্পন্ন করতে পারবেন। জার্মানিতে মূলত দুইভাবে আবেদন করতে হয়;

  • ইউনি এসিস্ট
  • ডিরেক্ট ইউনিভার্সিটি পোর্টাল

আপনি খুব সহজেই আপনার কোর্সের রিকোয়ারমেন্টস অনুযায়ী ডকুমেন্টস ইউনি এসিস্ট এ পাঠাবেন। ডিরেক্ট ইউনিভার্সিটির ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব পোর্টালে আপনি ডকুমেন্টস আপলোড করে খুব সহজেই আবেদন করতে পারবেন। অনেক শিক্ষার্থী রয়েছে শুধুমাত্র আবেদন প্রক্রিয়া কঠিন হওয়ার কারণে পিছিয়ে পড়েন।

পার্ট টাইম জবের সুবিধা

একজন ইন্টারন্যাশনাল ছাত্রের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে পার্ট টাইম জবের সুবিধা। লিভিং কস্ট বহন করার জন্য পার্ট টাইম জবের বিকল্প নেই। জার্মানিতে পার্ট টাইম জবের অনেক সুযোগ রয়েছে। যেখানে আপনি বৈধভাবে সপ্তাহে ২০ ঘন্টা ও মাসে ৮০ ঘন্টা কাজের অনুমতি পাবেন। বড় শহরগুলোতে কাজের অভাব নেই। ছোট শহরগুলোতেও পার্ট টাইম জবের সুযোগ রয়েছে। তবে সেক্ষেত্রে ভাষা জানা থাকলে সহজেই পার্ট টাইম জব ম্যানেজ করা যায়।

আরও পড়ুনঃ জার্মানির সেরা ১০টি শহর কোনগুলো

চাকরি খোঁজার ভিসা

আপনার পড়াশোনা শেষ করার পর আপনাকে ১৮ মাসের জন্য একটি ভিসা দেওয়া হবে, আর সেটিই হচ্ছে জব সিকিং ভিসা। আপনাকে জব খোঁজার জন্য আপনাকে ১.৫ বছর সময় দেওয়া হবে। এই সময়ের মধ্যে আপনাকে জব খুঁজে নিতে হবে। আপনার যথাযথ যোগ্যতা, দক্ষতা থাকলে আপনি নিশ্চই একটি ফুল টাইম জব পেয়ে যাবেন।

উচ্চ বেতনের চাকরি

আপনি আপনার পড়াশোনা শেষ করে ফুল টাইম জব করবেন নিশ্চই। জার্মানিতে ফুল টাইম জব করলে, আমাদের দেশের সাথে তুলনা করলে প্রায় ১০ গুণ বেশি স্যালারিতে জব করতে পারবেন। আমি যদি একটি উদাহরণের মাধ্যমে বলতে চাই, জার্মানিতে একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের বেতন ৩,৫০০ ইউরো থেকে ৬ হাজার ইউরো পর্যন্ত হয়ে থাকে। সুতরাং উচ্চ বেতনের চাকরি করতে চাইলে জার্মানি আপনার জন্য।

স্পাউস নেওয়ার সুবিধা

স্পাউস যদি সাথে না থাকে পড়াশোনা কিংবা চাকরি সবকিছুই বিষাদময় লাগে। আপনার বিষাদময় জীবনকে আনদময় করতে আপনি আপনার স্পাউসকে আপনার কাছে নিয়ে যেতে পারবেন। এমনকি ছাত্র অবস্থায় আপনি আপনার স্পাউসকে (বউ/জামাই) জার্মানিতে নিয়ে যেতে পারবেন।

ফ্রি ভ্রমণ সুবিধা

বিশ্বের আর কোথাও এমন সিস্টেম আছে কীনা তা আমার জানা নেই। তবে জার্মানিতে এই সুবিধাটি আমার বেশ ভালো লেগেছে। আপনারা ইতিমধ্যেই জানেন জার্মানিতে কোন প্রকার টিউশন ফি নেই। তবে প্রতি সেমিস্টারে আপনাকে সেমিস্টার কন্ট্রিবিউশন ফি দিতে হবে। মজার বিষয় হচ্ছে, তার বিনিময়ে আপনাকে একটি সেমিস্টার কার্ড দেওয়া হবে। যা দিয়ে আপনি আপনার স্টেটের কোন কোন ক্ষেত্রে আপনার শহরের বাস ও ট্রেনে ফ্রিতেই ভ্রমন করতে পারবেন।

স্থায়ী হবার সুযোগ

পড়াশোনা শেষে সবাই স্থায়ীভাবে বাস করতে চায়, নাগরিকত্ব পেতে চায়। জার্মানিতে আপনি একজন ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট হিসেবে এই সুযোগটি আপনিও নিতে পারবেন। জার্মানিতে পড়াশোনা শেষ করে আপনার ফুল টাইম জব থাকলে আপনিও স্থায়ী হতে পারবেন।

জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার অসুবিধা

  • ব্লক একাউন্ট
  • ভাষা বিড়ম্বনা
  • ভিসা এপয়েন্টমেন্ট
  • উচ্চ জীবনযাত্রার খরচ
  • আবহাওয়া

ব্লক একাউন্ট

জার্মানিতে পড়তে যাওয়ার সবচেয়ে বড় বাঁধা হচ্ছে ব্লক একাউন্ট। টিউশন ফি না লাগলেও আপনার লিভিং কস্ট আপনাকেই বহন করতে হবে। সেকারনে আপনাকে ১০,২৩২ ইউরো ব্লক করতে হবে। তবে সেটা আপনি জার্মানি যাওয়ার পর প্রতি মাসে ৮৬১ ইউরো করে তুলতে পারবেন। অনেকেই সময়মত এই ব্লক একাউন্টের টাকা যোগাড় করতে না পারায় স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। জার্মানি যাওয়ার ক্ষেত্রে এটাই সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা বলে আমি মনে করি।

ভাষা বিড়ম্বনা

জার্মানিতে পড়াশোনা করার ক্ষেত্রে ভাষা কোন প্রকার প্রভাব ফেলে না। আপনি সহজেই ইংরেজি কোর্সে আপনার কাঙ্ক্ষিত কোর্সটি শেষ করতে পারবেন। তবে সমস্যাটা বাদে চাকরির বেলায়। প্রায় প্রতিটি চাকরির ক্ষেত্রেই মিনিমাম লেভেলের ভাষা জানতে হয়। সেটা হতে পারে বি১ লেভেল। এছাড়াও দৈনন্দিন জীবনে ভাষা জানাটা অপরিহার্য। স্থায়ী ভাবে বসবাস কিংবা নাগরিকত্ব সেক্ষেত্রেও আপনাকে ভাষা জানতেই হবে।

আমি যদি এক কথায় বলতে চাই, জার্মানিতে থাকতে হলে আপনার জার্মান ভাষা জানাটা জরুরি।

ভিসা এপয়েন্টমেন্ট

ভিসা এপয়েন্টমেন্ট বড় ধরনের সমস্যা না হলেও এখন এটি একটি দুর্ভোগের কারণও বটে। সাম্প্রতিককালে ভিসা এপয়েন্টমেন্ট পেতে শিক্ষার্থীদের বেশ বেগ পেতে হয়। দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়। এমন অনেক হয়েছে যে, ভার্সিটির ক্লাস শুরু হয়ে গেছে কিন্তু এপয়েন্টমেন্ট এখনো পায়নি। তবে আগে মোটেও এরকম ছিলনা। করোনার কারণে এপয়েন্টমেন্ট পেতে আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি সময় লাগছে। তবে আমরা আশাবাদী খুব শীগ্রই এটি আগের মত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।

এছাড়া জার্মানি আসার ক্ষেত্রে তেমন বড় কোন বাঁধা বা অসুবিধা নেই। আবহাওয়া কিছুটা ঠান্ডা হলেও সবাই নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়েছে, আপনিও পারবেন। এখানে যেসব অসুবিধার কথা বলা হয়েছে, সেগুলো খুব একটা সমস্যা তা তা কিন্তু নয়।

জার্মানিতে উচ্চশিক্ষা গ্রহনের জন্য কোন বাঁধাই আপনাকে দমিয়ে রাখতে পারবেনা। নিজের শ্রম মেধা দিয়ে লেগে থাকুন। সাফল্য আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।

Subscribe For Latest Updates!

Get higher-study abroad, visa & migration-related latest updates from eGal!

Invalid email address
We promise not to spam you. You can unsubscribe at any time.

2 thoughts on “জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার সুবিধা ও অসুবিধা

  • 29/04/2022 at 3:25 PM
    Permalink

    ব্লক অ্যাকাউন্ট কখন খোলা যাবে?
    বা, কখন খুললে ভালো হয়?

    Reply
  • 03/06/2022 at 5:39 PM
    Permalink

    স্টুডেন্ট ভিসা য় দেখা যায় যে অনেকেই গিয়েই চাকরি করতে পারে ভিসা তে এমন একটি ক্লজ দেওয়া থাকে । কিন্তু কোন কোন ভিসা সে ক্লজ থাকে না। এবং না থাকাতে ওই ছাত্রটি গিয়ে কাজ করতে পারেন তার কারণ কি একটু জানাবেন।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.